দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা, হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, তুরস্ক এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে নিয়ে একের পর এক বক্তব্য দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ভাষণের শুরুতেই কয়েক ডজন কূটনীতিক অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। একই সময়ে গ্যালারিতে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের উচ্ছ্বাসধ্বনি শোনা যায়।
কূটনীতিকরা বেরিয়ে যাওয়ার পর নেতানিয়াহু তাদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যারা তার দেশ বা ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ে ‘মিথ্যা’ ছড়াচ্ছেন, তারা কক্ষের ভেতরে থাকুন বা নিউইয়র্কের মেয়রের কার্যালয়ে থাকুন, তাদের ‘লজ্জা হওয়া উচিত’।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে সরাসরি আক্রমণ করে নেতানিয়াহু তাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে অভিহিত করেন। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি মামদানিকে আক্রমণ করে বলেছিলেন, জাতিসংঘে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের বিষয়ে ‘সত্য’ এবং মামদানি সম্পর্কে ‘সত্য’ তুলে ধরবেন।
ইরান প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’। তিনি বলেন, ইসরায়েল ‘সাত ফ্রন্টের যুদ্ধে’ লড়ছে। এসব ফ্রন্টের মধ্যে হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি, ইরান এবং ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে ঠেকানোর দাবিও করেন নেতানিয়াহু। তার ভাষ্য, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা কঠিন হলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার নেওয়া সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল। তবে ইরান বারবার বলে আসছে, তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেনি এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও এমন অস্ত্র তৈরির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়নি।
ইরানের প্রতিনিধিদলকে উপহাস করতেও ভাষণে একটি সাদা বাক্স বের করেন নেতানিয়াহু। তিনি জানান, বাক্সে থাকা স্টারলিংক যোগাযোগযন্ত্রটি ইরানের প্রতিনিধিদলের জন্য রেখে যাবেন। তার দাবি, এই যন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ সত্য জানতে, নিজের পছন্দ প্রকাশ করতে এবং চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চা করতে পারে। ইরানের শাসকগোষ্ঠী ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইরানের প্রতিনিধিদলের উদ্দেশে নেতানিয়াহু আরও বলেন, তারা ‘অনিবার্যভাবে দলত্যাগ’ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে এই যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবে।
হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গেও ভাষণে একটি পেজার হাতে তুলে নেন নেতানিয়াহু। দর্শকদের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, তারা এগুলো মনে রেখেছেন কি না। পরে বলেন, ‘অবশ্যই হিজবুল্লাহ এগুলো মনে রেখেছে।’ এ সময় উপস্থিত দর্শকদের কাছ থেকে করতালি শোনা যায়। তিনি ২০২৪ সালে লেবাননে হাজার হাজার পেজার বিস্ফোরণের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেন। ওই ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও কথা বলেন নেতানিয়াহু। তার দাবি, এসব ঘটনায় মাত্র ‘১৫০ জনের মতো তরুণ অপরাধী’ জড়িত, যারা পাথর ছোড়ে, জলপাইগাছ কাটে এবং কখনো আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ড তিনি সমর্থন করেন না এবং ইসরায়েল আইনের দেশ হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে শিন বেতকে কাজে লাগানো হয়।
তবে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে পদ্ধতিগত ও রাষ্ট্রীয় সমর্থনপুষ্ট কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছে। বি’তসেলেমের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে বসতি স্থাপনকারী মিলিশিয়াদের হামলায় অন্তত ৩৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকেও আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। তিনি তুরস্ককে ‘ইহুদিবিদ্বেষী মিথ্যার অতিপ্রচারক’ হয়ে ওঠা দেশগুলোর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে অভিহিত করেন। তার দাবি, এরদোয়ান সিরিয়া দখলে নিতে চান এবং প্রায় প্রতিদিন ইসরায়েল ধ্বংসের আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলের জন্য ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো অংশীদার তারা পায়নি। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্বের’ জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। নেতানিয়াহুর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা না চালালে ইরান তার ‘উন্মাদ কল্পনাগুলো’ বাস্তবায়ন করত।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকেও ভাষণে সরাসরি সম্বোধন করেন নেতানিয়াহু। গোলান মালভূমি প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ‘মূসার সময়’ থেকেই ইহুদিরা ওই এলাকায় রয়েছে। সিরিয়া এর আগে ওই ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল।
ভাষণের শুরুতে কূটনীতিকদের বেরিয়ে যাওয়া এবং পরে গ্যালারিতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই বক্তব্য চালিয়ে যান নেতানিয়াহু। তার ভাষণে ইরান, গাজা, পশ্চিম তীর, তুরস্ক, সিরিয়া, হিজবুল্লাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
সূত্র: আল-জাজিরা
/অ